মানুষের উন্নতির পরিণত রূপই সভ্যতা। দুনিয়ায় মানুষের উৎপত্তির সময় নিয়ে দর্শনগত ঐকমত্য না থাকলেও প্রাচীনসভ্যতার ইতিহাস নিয়ে দ্বিমত নেই। প্রায় ৮/১০ হাজার বছর আগে অ্যাসীরীয়রা লোহার অস্ত্রে সজ্জিত হওয়ার বিজ্ঞান, পৃথিবীর অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ বের করার মত ভৌগলিক জ্ঞান, রাষ্ট্রচিন্তায় সামরিক রাষ্ট্রের ধারণা আবিষ্কার করে। সমসাময়িক সুমেরীয়রা তৈরি করে উন্নত সেচব্যবস্থা, চাকা আবিষ্কার করে, জলঘড়ি, চন্দ্রপঞ্জিকার আবিষ্কার করে, কিউনিফর্ম বর্ণমালার উদ্ভাবন করে ইত্যাদি। আবার সেই কিউনিফর্ম অ্যালফাবেটে ব্যবিলনীয় সভ্যতায় রচিত হয় মহাকাব্য গিলগামেশ। ব্যবিলনীয় সভ্যতার স্থপতি অ্যামোরাইট নেতা হাম্মুরাবি আইনসংকলন করেন। তারাই পৃথিবীর প্রাচীনতম মানচিত্র আঁকেন। ক্যালডীর সভ্যতার স্থপতি নেবুচাঁদনেজারের শূন্যউদ্যান বা ব্যবিলনের শূন্যউদ্যান (The Hanging Garden of Babylon) আজও পৃথিবীর প্রাচীন সপ্তার্শ্চযের একটি হিসেবে বিবেচিত। এই ক্যালডীয়রা সপ্তাহকে ৭ দিন এবং প্রতিদিনকে জোড়া ১২ ঘণ্টায় ভাগ করেন।
খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ অব্দে মিশরীয়রা জ্যামিতি, পাটিগণিত, যোগ, বিয়োগ ও ভাগের ব্যবহার শিখেছিল। তারা সৌরপঞ্জিকা চালু করেছিল। সময় নির্ধারণের জন্য সূর্যঘড়ি, ছায়াঘড়ি ও জলঘড়ির আবিষ্কার করেছিল। মৃতদেহ পচন থেকে রক্ষা করার জন্য মমি তৈরি, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চিকিৎসা, হাড় জোড়া লাগানো, হৃৎপিন্ডের গতি ও নাড়িস্পন্দন নির্ণয় করার মত চিকিৎসা শাস্ত্রের উন্নতি সাধন করে।
সিন্ধুসভ্যতার দিকে তাকালে উন্নত নগর পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির ধারণা পাওয়া যায়। পথের ধারে সারিবদ্ধ ল্যাম্পপোস্ট, প্রত্যেক বাড়িতে খোলা জায়গা, কূপ, স্নানাগার ইত্যাদি। তারা দৈর্ঘ্য পরিমাপের জন্য দাগকাটা স্কেল ও বিভিন্ন মাপের বাটখারা ব্যবহার করত। তামা ও টিনের মিশ্রণে ব্রোঞ্জ তৈরি, সোনা, রূপা, তামা, ইলেক্ট্রামের অলঙ্কার ব্যবহার ধাতুশাস্ত্রের উন্নত প্রযুক্তির নিদর্শন বহন করে। জ্যোতিষশাস্ত্রে ফিনিশীয়দের ধ্রুবতারার সাহায্যে দিক নির্ণয়, নাবিকবিদ্যা, জাহাজনির্মাণ শিল্প ছাড়াও বর্ণমালায় স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণের ভাষাগত জ্ঞান দেখতে পাই। গ্রীকসভ্যতার সক্রেটিস-অ্যারিস্টেটল ছাড়াও ইউক্লিডের পদার্থবিদ্যা-জ্যামিতি, গণিতবিদ পিথাগোরাস, চিকিৎসাশাস্ত্রে হিপোক্রিটাস এখনো খ্যাত। এছাড়াও রোম, ইজিয়ান, ইনকা, মাচ্ছুপিছু সভ্যতাও উন্নত সভ্যতা হিসেবে ইতিহাসে স্থান লাভ করেছে।
এত উন্নত ও সমৃদ্ধ সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গেল। এমনকি চিহ্নটুকুও পর্যন্ত মুছে গিয়েছে। তখনকার মানুষ মনে করত এসব সভ্যতা অনন্তকাল টিকে থাকবে। কিন্তু থাকেনি। কেন থাকেনি? আমাদের বর্তমান সভ্যতা কি টিকে থাকবে? টিকলে কতদিন টিকতে পারে? না টেকার কারণ কী? প্রতিটা সভ্যতার জন্মের ইতিহাস খেয়াল করলে সেখানকার নি’জাম বা ওয়ার্ক অর্ডার (Work Order) দেখি। ওয়ার্ক অর্ডার বলতে অল্প কিছু মানুষের ব্রেইনচাইল্ড এবং সেই ব্রেইনচাইল্ডের অধীনে একদল শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রম। যে-ই নিজাম বা ওয়ার্ক অর্ডার বা শাসনতন্ত্রের কারণে যেভাবে সভ্যতার উত্থান হয়েছিল, সে-ই নিজাম বা ওয়ার্ক অর্ডার বা শাসনতন্ত্রের কারণে সেভাবে সভ্যতাগুলোর পতনও হয়েছিল।
সভ্যতার উৎপত্তি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়। কিন্তু উৎপত্তি বা উন্নয়নের ভিত্তি হচ্ছে ইকোনমি অ্যান্ড ইকোনমিক অর্ডার (Economy and World Economic Order)। অর্থনীতিই সভ্যতার ব্লাডলাইফ (Bloodlife) বা চালিকাশক্তি। যখনই অর্থনীতির পতন ঘটেছে তখনই সভ্যতার পতন ঘটেছে। অর্থায়ন বা অর্থনীতি বিষয়টা বাণিজ্য থেকে ভিন্ন একটা টার্ম। অর্থায়ন বা অর্থনীতি হচ্ছে আমরা কীভাবে অর্থসংস্থান করছি, কোথা থেকে উপার্জন, কোথায় বিনিয়োগ এরপর তার সীমারেখা ও বিধিবিধান। অর্থাৎ কোথায় থেকে অর্থায়ন ও বিনিয়োগ করা যাবে না ইত্যাদিও। এখানেই ধর্মের বা দর্শনের প্রয়োগ ঘটে।
১৯৩০ এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা, এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, হাজার বছরের খেলাফতের বিলুপ্তি, সুদমুক্ত শরীয়াহ অর্থনীতির বিকল্প হিসেবে ব্রেটন উডস কনফারেন্সের মাধ্যমে হ্যারি ডেক্সটার হোয়াইট ও জন মেনার্ড কেইনসের ব্রেইনচাইল্ড ও ৪৪ টি দেশের ৭৩০ জন প্রতিনিধির মাধ্যমের New World Economic Order হিসেবে প্রথম International Bank of Reconstruction and Development গঠিত হয়। যার উদ্দেশ্য যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপ ও এশিয়ার অবকাঠামো পুনর্নিমাণ। এটিই মূলত বিশ্বব্যাংক গ্রুপ হিসেবে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত।
এই ধারণার উপর ভিত্তি করে আজকের ইকোনমিক সিস্টেম (Economic System)। এই সিস্টেমের ত্রুটি এতটা প্রকট যে গতবছর মাত্র তিনদিনের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত নামকরা Silicon Valley Bank এবং Signature Bank দেউলিয়া হয়ে যাওয়ায় বন্ধ ঘোষণা করা হলো। এর ফলে শেয়ার বাজারে ব্যাপক দরপতন। জাপান, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের অনেক দেশের স্টক মার্কেটের সূচক-উপসূচকে ভারসাম্যহীনতা ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। বুশের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা নোবেল অর্থনীতিবিদ বেন বার্নান এসবকে ১৯৩০ সালের মন্দার সাথে মিল করেন এবং নোবেল স্মারক পান। অর্থনীতিবিদদের অগণিত গবেষণা ও প্রবন্ধ লেখা হয়েছে বর্তমান অর্থনীতির অসারতা নিয়ে। বস্তুত আজকের অর্থনীতিটাই Speculation বা ফটকার উপর দাঁড়িয়েছে। একটু সহজ ভাষায় ব্যাখা করলে আমরা যেটি দেখি, অনেক মানুষের সঞ্চিত অর্থকে একসাথে করার পদ্ধতি আজকের ব্যাংকিং সিস্টেম। এবং সেই সঞ্চিত বিশাল অর্থ বড় অর্থায়ন প্রকল্পে বিনিয়োগরের মাধ্যমে বৃহৎ শিল্পায়ন করার কনসেপ্ট। আপাতদৃষ্টিতে এটি সুন্দর সিস্টেম মনে হলেও তা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ যেসব মানুষের অর্থ ব্যাংকগুলো আমানত হিসেবে নিয়েছে সেসব অর্থের বেইসড আপ(Based Up) কোনো অ্যাসেট(Asset) তৈরি হয়নি। আবার ব্যাংক যাদেরকে বিনিয়োগ হিসেবে দিচ্ছে সে অর্থের বিপরীতে ব্যাংকের কোনো ব্যাকড আপ অ্যাসেট তৈরি হচ্ছে না। ফলে এক ধরনের শূন্য-শূন্য খেলার মত ইকোনমি চলছে। অর্থের নিশ্চয়তার জন্য অসংখ্য নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান থাকার পরেও এই Speculation বা ফটকা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। মুদ্রাপাচার, ফান্ড ডাইভার্টসহ সব রকম মাদক ও অবৈধ চোরাচালানে ব্যাংকের সঞ্চিত অর্থ ব্যবহার হচ্ছে। একদিকে সুদের কারণে বৈষম্য বেড়ে চলেছে, অপরদিকে ফটকা ও অনিশ্চয়তার কারণে বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অসারতা প্রকট হচ্ছে। বর্তমান ইকোনমিক সিস্টেম তথা ব্যাংক ও ফাইন্যান্স এতটাই নাজুক যে সরকারি-বেসরকারি কোনো ব্যাংকের অবস্থা ভালো নয়। শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো শরীয়াহ প্রতিপালন না করায় সংকটে ভোগছে। বেশিরভাগ অর্থ নন পার্ফমিং হয়ে আছে। বাংলায় বলে খেলাপি ঋণ। অর্থাৎ অর্থগুলো আর কাজ করছে না। অর্থগুলো তো নেই, কাজ করবে কেমনে! আমাদের জমানো টাকাগুলো ব্যাংকে নামমাত্র আছে। ব্যাংক চাইলেও এগুলো ফেরত দিতে পারবে না। এগুলোর বিপরীতে ব্যাংকের কাছে কোনো অ্যাসেট ব্যাকড আপ নেই, অর্থাৎ অর্থগুলোও নেই। শূন্য-শূন্য খেলার এক অন্তিম পরিণতির দিকে ব্যাংকগুলো। এর ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলছেন, ব্যাংকগুলো মার্জ হতে পারে। তাতে ব্যাংকগুলো কর্মী ছাটাই করবে। আপাতত কিছুটা খরচ কমাতে চেষ্টা করবে। সরকারি এবং বেসরকারি উভয় খাতে অপারেশনাল খরচ (Operating Cost) কমানোর জন্য লোক ছাটাই হতে পারে। বর্তমানে দেশের অনেকগুলো ব্যাংক তাদের এই খরচ কমানোর জন্য ব্যাপকহারে ছাটানোর পথে আগাচ্ছে। পুঁজিবাদী সিস্টেমে বেশি বেতন বা খরচযুক্ত জবগুলো বেশিদিন রাখে না, ছাটাই করে। কিন্তু ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে তাতে মূল সমস্যার সমাধান হবে না। মূল সমস্যার সমাধান হচ্ছে বাইরে চলে যাওয়া টাকা ফেরত আসা এবং ফান্ড ডাইভার্ট হওয়া অর্থ রিভার্ট হওয়া। কিন্তু তা কখনো সম্ভব নয়। দেশে প্রচলিত ধারার ব্যাংক বা অর্থনৈতিক সিস্টেমের অলরেডি বারোটা বেজে গিয়েছে। রিয়েলেটি মাইনে নিতে হবে। এ সিস্টেমে কাজ করতে চাওয়া তরুণদের জন্য অর্থাৎ সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকে কাজ খোঁজা লোকদের জন্যও ভালো কোনো আশা নেই।
এবং সেখান থেকে রূপান্তরের উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে চলেছে। উদাহরণস্বরূপ- ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ সরকারের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর “সারাদেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ” প্রকল্প নামে সর্বপ্রথম সুকুক ইস্যু করে। সুকুকে ইসলামী রীতি অনুসরণ করা হয়। এখানে সুদের ব্যবস্থা নেই, আছে মুনাফা। এছাড়া এখানে ফটকার কোনো সুযোগ নেই। প্রতিটা ফাইন্যান্স Asset based and Asset Backed. অর্থাৎ প্রতিটা শেয়ারের যতখানি মূল্য ঠিক ততখানি Asset বরাদ্দ থাকছে। প্রচলিত ধারার ব্যাংকিং ও অর্থায়নের মত শূন্য-শূন্য খেলার স্থান এখানে নেই। Islam is the complete code of life (sura al Imran) বা পূর্ণাঙ্গবিধান হিসেবে ব্যক্তিক, পারিবারিক, রাজনৈতিক সমাধানের মত অর্থনৈতিক সমাধানও দিয়েছেন। আর সেভাবে গত এক হাজার বছরেরও বেশি সময় সুদমুক্ত ও ভারসাম্যপূরণ অর্থব্যবস্থা জারি ছিল। মানবতার অর্থনৈতিক এসব সমস্যা সমাধানে গত শতকে OIC গঠন, IDB, AAOIFI, IFS (Islamic Financial System) কাজ করে যাচ্ছে। মুসলিম দেশগুলো ছাড়াও রাশিয়া, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার দেশেও Islamic Financial System বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠছে। Islamic Financial System ও Conventional Financial System এর মধ্যে পার্থক্য শুধু সুদের ক্ষেত্রে নয়। Asset based, Asset backed, Speculation, Gharar, Mysir ইত্যাদি অনেকগুলো টার্মে পার্থক্য আছে। অর্থাৎ ইসলামিক ফাইনান্সিয়াল সিস্টেম অথবা অলটারনেটিভ ফাইনান্সিয়াল সিস্টেমে বর্তমান প্রথাগত ব্যবস্থার মত কোনো ত্রুটি নেই। সেখানে ফটকা, অনিশ্চয়তা ও সব ধরনের ভারসাম্যহীন ও ক্ষতিকর পন্থায় বিনিয়োগ বন্ধ করার পদ্ধতি ঘোষিত হয়েছে। যে বৈপ্লবিক আহবানে ইসলাম শতাব্দীর পর শতাব্দী সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখছে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও সেই একই বিপ্লবী আহবান। আহবানটা হলো- “আসমান এবং জমিনের রব কেবল একজনই।” তাছাড়া “ইনিল হুকমু ইল্লা লিল্লাহ” (ইউসুফ-৬৭)। অর্থাৎ হুকুম দেয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তাআলার। আর যখনই রবের এ বিধানের ব্যত্যয় ঘটবে তখনই পৃথিবীতে বিপর্যয় তৈরি হবে। মহাশূন্যের মাঝে কোনো ধরনের ঠেস ছাড়া যেভাবে পৃথিবী, গ্রহ, নক্ষত্র ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে; কোনোটা পড়ে যাচ্ছে না। ঠিক রবের বিধানই এমন ভারসাম্যপূর্ণ। লাক্বাদ খালাকনাল ইনসানা ফি ক্বাবাদ বা মানুষকে শ্রমনির্ভর করে সৃষ্টি করা হয়েছে অর্থাৎ মানুষকে জীবন ধারণ ও জীবিকার জন্য শ্রমের উপর নির্ভরশীল বলে মূলত আলস্যকে নিরৎসাহিত করা হয়েছে এবং যাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে ভারসাম্যপূর্ণ ও সমৃদ্ধ অর্থব্যবস্থার দিকনির্দেশ করা হয়েছে। আবার ফটকাবাজি, সুদ ও সব ধরনের অন্যায্যপন্থা ও ক্ষতিকরপন্থায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এভাবে ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই অর্থব্যবস্থা নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
ইসলামে অর্থনৈতিক বিধান এতটা গুরুত্বপূর্ণ যে কেয়ামতের মাঠে ৫ টি প্রশ্নের জবাব দেয়া ছাড়া কোনো আদম সন্তানকে এক কদমও নড়তে দেয়া হবে না, তার মধ্যে ২ টা প্রশ্ন অর্থনীতিভিত্তিক। উপার্জনটা কোথায় থেকে করা হয়েছে এবং কোথায় বিনিয়োগ ও ব্যয় করা হয়েছে। প্রচলিত সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থায় নিজেদেরকে সুদি ব্যবস্থা থেকে মুক্ত রাখা কঠিন। তার জন্য যথাযথ ইলম ও চিন্তা প্রয়োজন। কেননা, সুদখোর, সুদদাতা, সুদভিত্তিক লেনদেনের লেখক, স্বাক্ষী প্রত্যেককে অভিশাপ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও সুদের ব্যাপারে আরো ভয়ঙ্কর নির্দেশনা রয়েছে কুরআন-হাদিসে। সুতরাং সে পথ থেকে উপার্জিত অর্থ যে সম্পূর্ণ হারাম তাতে দ্বিমত পোষণ করার সুযোগ নেই। এক পয়সা উপার্জন করলে, ঐ এক পয়সাটাই হারাম। আর আমাদের কোনোভাবে মনে করার সুযোগ নেই যে বর্তমান অর্থব্যবস্থায় শ্রম দিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ উপার্জন করে পরে ফিরে আসলে শান্তি পাব। তাহলে সেটি এক ধরনের আত্মপ্রতারণা্। কারণ শান্তি ও কল্যাণের জন্য আমাদের বিশ্বাস হচ্ছে , “ হে আল্লাহ! তুমি শান্তিময় এবং তোমার কাছে থেকে শান্তি আসে। তুমি কল্যাণময় এবং সম্মান প্রতিপত্তির অধিকারী।” (মুসলিম -৫৯১) এ দুআটি প্রত্যেক সালাতে সালাম ফেরানোর পর আমরা পড়ি। শান্তি, কল্যাণ, সম্মান, প্রতিপত্তি সবই আল্লাহর কাছে এবং আল্লাহর বিধানে।
আর এ বিধানের কিছু অংশেও যদি সংশয় তৈরি হয় বা বৈপরিত্যে অবস্থান করি তাহলে আমাদের বিশ্বাসের পূর্ণতা পাওয়ার কোনো সুযোগ আছে কিনা নিজের বিবেককে প্রশ্ন করতে পারি। তাছাড়া কুরআন হাদিসের কিছু অংশ মানা আর কিছু অংশ না মানার ভয়ানক পরিণতির কথা বলা হয়েছে। দুনিয়ায় অসম্মান, গ্লানি এবং পরকালে জাহান্নামে আগুনে জ্বলতে হবে সেটি আমাদের বিশ্বাস। তবুও যদি মনের ভেতরে কাজ করে যে আল্লাহর বিধানের বাইরে গিয়ে সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব তাহলে আমাদের পূর্ববর্তী সভ্যতাগুলোর দিকে খেয়াল রাখা দরকার। কুরআনে বর্ণিত আদ, সামুদ, বনী ইসরায়েল (মিশরীয় সভ্যতা)সহ অসংখ্য জাতি ও সভ্যতাকে ধ্বংস করে দেওয়ার কথা জানতে পারি। কুরআনে বর্ণিত কত জাতি ও সভ্যতাকে মাটির সাথে ধ্বসিয়ে দেয়া হয়েছে এবং মিশিয়ে দেয়া হয়েছে সেসব পড়ে এবং মিলিয়ে দেখতে পারি। তার বিধানের বিপরীতে গিয়ে আমাদের উপার্জনটা তিনি নিশ্চিহ্ন করে দেবেন। এটা আল্লাহর ওয়াদা। মুসলমান কুরআনের এ বাণীতে সংশয় রাখে না। “তিনি রিবাকে নিশ্চিহ্ন করে দেবেন”। (বাকারা- ২৭৬)
আল্লাহ আমাদেরকে তার বিধানের পথ থেকে যেন বিচ্যুত না করেন।
Comments
Post a Comment