Skip to main content

আমাদের সংস্কৃতি

নন্দিত সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ মরহুম আবুল মনসুর আহমদ জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগের হয়ে মন্ত্রীত্ব করেছেন, দলকে দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন; দল ও দলীয় নেতাদের অবিমৃষ্যকারিতার কঠোর সমালোচনা করেছেন এবং চাবুক মেরে বিভ্রান্ত নেতৃত্বকে সোজা করার চেষ্টা করেছেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের প্রথম ঐ সময়ের আধিপত্যবান্ধব নীতি-বৈশিষ্ট্য এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিরোধী কর্মকান্ডকে তিনি সহজভাবে নিতে পারেননি এবং দলীয় প্লাটফর্ম ও সংবাদপত্রের কলামে যখন যেখানে সম্ভব হয়েছে তার তীব্র সমালোচনা করেছেন। ‘বেশি দামে কেনা কম দামে বেচা আমাদের স্বাধীনতা’ শীর্ষক পুস্তকটি আবুল মনসুর আহমদের একটি অমর কীর্তি। এই পুস্তকে সন্নিবেশিত ৪২টি প্রবন্ধের প্রত্যেকটিতে ঐ সময়ের রাজনীতি আমাদের স্বাধীনতাকে কিভাবে বিপন্ন করে তুলেছিল তার সুস্পষ্ট অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে। প্রচুর রক্তপাত ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের এই স্বাধীনতাকে জনাব আবুল মনসুর আহমদ প্রাণের চেয়েও বেশি ভালবাসতেন। আর তার যে স্বাধীনতার কনসেপ্ট ছিল তা শুধু ভৌগোলিক স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি পরাধীনতাকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন। তার দৃষ্টিতে রাষ্ট্রীয় পরাধীনতা দৃষ্টিগ্রাহ্য। কিন্তু কৃষ্টিক বা সাংস্কৃতিক পরাধীনতা ধরাছোঁয়া ও দৃষ্টির ঊর্ধ্বে। তিনি বলতেন আমরা রাষ্ট্রীয় পরাধীনতার বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করেছি। অর্থনৈতিক পরাধীনতার বিরুদ্ধে কেউ কেউ সমাজবাদী হয়েছেন। কিন্তু সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার জন্য আমাদের কোন চেতনার লাখণই দেখা যায় না, যুদ্ধ করাতো দূরের কথা। বাংলাদেশ হবার পর একশ্রেণীর রাজনীতিবিদ ও সাংস্কৃতিক কর্মী এবং বুদ্ধিজীবী স্বাধীন বাংলার অভ্যুদয়কে অভিনন্দিত করতে গিয়ে অতি উৎসাহে বলতে শুরু করেন যে, ১৯৪৭ সালে যে মানদন্ডের ভিত্তিতে দেশ বিভাগ তথা পাকিস্তান হিন্দুস্থান হয়েছিল তা তথা দ্বিজাতিতত্ত্ব ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। যারা এ ধারণায় বিশ্বাস করতেন জনাব আবুল মনসুর আহমদ তাদের তীব্র সমালোচনা করে বলেছিলেন যে তারা আসলে স্বাধীনতার বন্ধু তথা পক্ষশক্তি নয়, শত্রু। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান হয়েছিল বলেই পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের বর্তমান ভূখন্ডকে নিয়ে আমরা স্বাধীন সার্বভৌম একটি দেশ গঠন করতে পেরেছি। যদি দ্বিজাতিতত্ত্ব মেনে নেয়া না হয় তাহলে তার যৌক্তিক পরিণতি দাঁড়ায় অবিভক্ত ভারতের অংশ হয়ে যাওয়া। সেক্ষেত্রে আমাদের স্বতন্ত্র, স্বাধীন ও সার্বভৌম অস্তিত্ব আর থাকে না। জনাব আবুল মনসুর আহমদ তার রচিত ‘‘শেরে বাংলা হইতে বঙ্গবন্ধু’’ শীর্ষক পুস্তকে এ কথাটি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছেন।

কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে হলে আগে তার সংস্কৃতি বিনাশ করে দাও। সংস্কৃতি মানে আত্মপরিচয়। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ভেতর দিয়ে একটা দেশ ও জনগণের নিজস্ব ইতিহাস, মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের ধরন উল্টাপাল্টা করে দেয়া হয় ও তার আত্মপরিচয়কে অস্পষ্ট করে তোলা হয়। পরিণতিতে ওই দেশ বা জনগণের স্থির বিশ্বাস ও মূল্যবোধে চিড় ধরে এবং তারা এক দীর্ঘ হীনমন্যতার জালে জড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত একটা হীনমন্য জাতির নিয়তি হয় পরাধীনতা। আগের মতো স্বাধীনতা হরণ করার জন্য সবসময় সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দেশ দখল করার নিয়মনীতি আজ অনেকখানি বদলে গেছে। দেখা গেছে সেনাবাহিনী পুষতে অনেক পয়সা-কড়ি লাগে। আবার সেই সামরিক আধিপত্য দীর্ঘদিন স্থায়ীও হয় না। এ কারণে আধিপত্য পাকাপোক্ত করতে প্রয়োজন হয় সাংস্কৃতিক দীক্ষার মাধ্যমে একদল হীনমন্যতাসম্পন্ন মানুষ তৈরি, যারা আগ্রাসনকারীর অভীষ্ট লক্ষ্য হাসিলে সর্বতোভাবে সাহায্য করে। এই দেশীয় সাঙ্গাতগুলো নিত্যনতুনভাবে আগ্রাসনকারীর কালচারকে লোভনীয় করে তোলে এবং উচ্চারণ করতে থাকে—কথা বল ওদের ভাষায়। নকল কর ওদের, অস্বীকার কর নিজের সত্তা এবং সৃজনশীলতাকে। তুমি রূপান্তরিত হও ওদের জাতিসত্তায়। আর তখনই সূচিত হয় সাংস্কৃতিক পরাধীনতা। আগ্রাসী শক্তিগুলো মাসমিডিয়াকে নিপুণভাবে ব্যবহার করে দেশের মানুষের মধ্যে একটা হীনমন্যতাবোধ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। যাতে প্রভুর নির্দেশে মোহাবিষ্টের মতো নিজেরাই নিজেদের প্রতিরোধ শক্তি ও আত্মরক্ষার প্রাচীরটি বিধ্বস্ত করে দেয়। রাজনৈতিক পরাজয় থেকে হয়তো দেশোদ্ধার সম্ভব। কিন্তু সাংস্কৃতিক পরাজয় ঘটলে তার থেকে স্বাধীনতা উদ্ধার অসম্ভব। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয়, দেশটি ভয়ানকভাবে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার হয়ে এর সাংস্কৃতিক সত্তা হারাতে বসেছে এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতাও বিপন্ন হয়ে উঠেছে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফলে দেশে হু হু করে ক্রীতদাসের সংখ্যা বাড়ছে। রাজনীতিতে বিদেশি বশংবদদের স্ফীতি ঘটছে। শিক্ষিত-বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর একটি বৃহত্ অংশ নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা, পদক, খেতাব ও পুরস্কার এমনকি নগদ প্রাপ্তির বিনিময়ে আত্মবিক্রয় করে বিদেশের দালাল শ্রেণীতে পরিণত হয়েছে। দেশের ভেতরে বসে আগ্রাসী শক্তির স্বার্থে তারা নিজেদের মেধা, বুদ্ধি ও কার্যক্রমকে ব্যবহার করছে।

 ★★★ আগ্রাসনের উৎসঃ আমাদের এখানে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ঘটছে দুটি উৎস থেকে। একটি হচ্ছে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের ইয়াংকি সংস্কৃতি। শক্তিশালী মাসমিডিয়া ও এখানকার পশ্চিমাকৃত মানুষজনের কল্যাণে এই সংস্কৃতি আমাদের সমাজে এখন ঢুকে পড়ছে বন্যার পানির মতো। কারণ নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে অহংবোধ লুপ্ত হলে পরগাছা সংস্কৃতি স্বাভাবিকভাবে মনোজগতকে গ্রাস করে ফেলে। আমাদের সমাজে এতকাল লিভ টুগেদার, লাভ চাইল্ড, থার্টিফার্স্ট নাইট, ভ্যালেন্টাইনস ডে, অসধর্ম বিয়ে প্রভৃতি শব্দ অজানা ছিল। এগুলো এখানে নিছকই সাম্প্রতিক সংযোজন এবং ধীরে ধীরে এটির সামাজিক ভিত্তি তৈরি করার চেষ্টা চলছে। এখন শুনতে পাচ্ছি, ঢাকার অভিজাত হোটেলগুলোতে বেকনের (শূকরের মাংস) খুব চাহিদা বাড়ছে এবং দেশীয় খদ্দেররাই এটি জমিয়ে তুলছে। এটা সত্য, সংস্কৃতি কোনো অচল বিষয় নয়, নিয়ত পরিবর্তনশীল। বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে এক ধরনের নীরব আদান-প্রদানও চলে। কিন্তু সেই আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে একটা মাপকাঠি থাকা দরকার এবং ছাঁকনি দিয়ে দেশের জন্য, জাতির জন্য ক্ষতিকর বিষয়গুলোকে অপসারণ করাও দরকার। সংস্কৃতি কোনো স্রোতের শেওলা নয় কিংবা সর্বজনীন বিষয়ও নয়। নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে আপন সংস্কৃতির জন্য হুমকির বিষয়গুলো চিহ্নিত ও প্রতিরোধ করা দরকার। কিন্তু আত্মবিস্মৃত, ঐতিহ্যলুপ্ত যে তরুণ কানে আইপি থ্রি লাগিয়ে এই ইয়াংকি সংস্কৃতির গুণগ্রাহী হয়ে উঠেছে, তার কাছে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের মূল্য কতটুকু? এ জন্যই দেখেছি ১/১১’র সময় বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা আমাদের রাজনীতিবিদদের নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়েছেন। অন্যদিকে আমাদের রাজনীতিবিদরা জাতির স্বার্থের বিনিময়ে নিজেদের স্বার্থের কারণে তাদের করুণাপ্রার্থী হওয়ার জন্য কতখানি লালায়িত হয়ে পড়েছিলেন। এ লজ্জা ঢাকার উপায় নেই। হীনমন্যতায় অবসিত একটা জাতির পক্ষেই এটা সম্ভব। আর এটা তখনই হয়, যখন নিজের অস্তিত্বের শিকড় কেটে দিয়ে জাতির পরিচালকরা অন্যের পরিচয়ে পরিচিত হতে চান।

 ★★আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের আর একটা উৎস হচ্ছে ভারত। দীর্ঘদিন ধরে ভারত, বিশেষ করে কলকাতাইয়া সংস্কৃতি এখানে ইনজেক্ট করেছে এবং এখানকার আপামর মানুষকে ছিন্নমূল জনগোষ্ঠীতে রূপান্তরিত করতে অনেকখানি সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকেই সব ধরনের মাসমিডিয়াকে ব্যবহার করে এখানকার মানুষের মগজ ধোলাই চলছে এবং এদেশের জন্ম ইতিহাস সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে ভারত সফল হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাস আর সংস্কৃতির প্রসঙ্গ এলেই একদল মানুষ বাঙালি সংস্কৃতির নামে মনগড়া থিওরি উপস্থাপন করেন। বাঙালি সংস্কৃতি নাকি একটি অবিভাজ্য জিনিস। হাজার বছর ধরে তা এখানে প্রবাহমান আছে। ব্রিটিশরাই নাকি মুসলিম জাতীয়তাবাদ বা সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দিয়ে সেই ঐক্যে ভাঙন ধরিয়ে দিয়েছে। ভালো কথা। কিন্তু কোনো ধরনের সাংস্কৃতিক পার্থক্যই যদি না থাকে, তবে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার পুনর্মিলন সম্ভব হলো না কেন? কেন দুই বাংলার রাষ্ট্রভাষা ও জাতীয়তাবাদ ভিন্ন রকম হয়ে থাকল? কারণ এ অঞ্চলের ইতিহাসের মধ্যেই সেই খণ্ডতা ও সাংস্কৃতিক তফাতের উপাদানগুলো রয়ে গেছে। এ কারণেই শরত্চন্দ্রের মতো ঔপন্যাসিকও তার শ্রীকান্ত উপন্যাসে বাঙালি ও মুসলমানের ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করেছেন। রবীন্দ্রনাথের মতো কবিও শিবাজী উত্সব, হিন্দুমেলা নিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়েছেন। তার আগে বঙ্কিম বাবু তো বাঙালি সংস্কৃতির চৌহদ্দিতে মুসলমানকে গণ্যই করেননি। এখন বাঙালি সংস্কৃতির নামে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালিয়ে বাংলাদেশের মানুষের এই স্বতন্ত্র আইডেনটিটি মুছে দেয়ার কাজটি মহাআয়োজনে চলছে। এদেশের অধিকাংশ মানুষের বিশ্বাস ইসলামকে বলা হচ্ছে মৌলবাদ কিংবা জঙ্গিবাদ। রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষার মহান কবি। কিন্তু তিনি তো বাংলাদেশের জাতীয় কবি নন। শেক্সপিয়র ইংরেজি সাহিত্যের কিংবদন্তি। ইংরেজি ভাষার সূত্রে তাকে নিয়ে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কিংবা সেখানকার সংস্কৃতি জগতে বিস্তর আলোচনা-গবেষণার কাজ চলে। কিন্তু তাই বলে আমেরিকার জাতীয় অনুষ্ঠানে তাকে নিয়ে আসা হয় না। সেখানে আনা হয় ওয়াল্ট হুইটম্যানকে কিংবা দেখানো হয় ইউজিন ও নীলের নাটক। এটাই সংস্কৃতি। রবীন্দ্রনাথ আমাদের এখানে সাহিত্য-শিল্পের বিষয়ের চেয়ে রাজনীতির কারণে বেশি আলোচিত হন। রবীন্দ্রনাথের কবিসত্তাকে ব্যবহার করে কলকাতাইয়া সংস্কৃতি অনুপ্রবেশের এখানে আয়োজন চলছে বহুদিন ধরে। এ কারণেই বশংবদদের হাতে স্মরণোৎসবের নামে রবীন্দ্র, বঙ্কিম, সূর্য সেন, বিদ্যাসাগর, প্রীতিলতা এমনকি কেরি সাহেবরা প্রাধান্য পান অনেক বেশি। অন্যদিকে আমাদের জাতীয় অগ্রনায়করা যেমন নজরুল, ফররুখ, কায়কোবাদ, গোলাম মোস্তফা, শাহাদত্ হোসেন, সিরাজদ্দৌলা, রজব আলী, তিতুমীর, শরীয়তুল্লাহ, আমীর আলী, নওয়াব সলিমুল্লাহ প্রমুখ স্মরণীয় মানুষকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা চলছে এবং এই প্রক্রিয়াটি একটি এজেন্ডার মাধ্যমে আগ্রাসী শক্তি বশংবদদের মাধ্যমে করিয়ে নিচ্ছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়ছে, মীর মশাররফ হোসেন কিংবা শাহেদ আলীর মতো কোনো কথাশিল্পী কিংবা ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী, নাজিমুদ্দীন, আকরম খান, আবুল হাশিমের মতো কোনো রাজনীতিবিদ এদেশে কখনও ছিলেন, তা-ই বোধ হয় গবেষকদের গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে গোটা জাতি আজ অবসন্ন। তাদের প্রাণশক্তি নিস্তেজ করে দেয়া হয়েছে। এ কারণেই সীমান্তে ফেলানীর লাশ ঝুলে থাকে, কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না। দেশের পানিসম্পদ, গ্যাস সম্পদ, সমুদ্র বন্দর, করিডোরসহ সবকিছু আগ্রাসী শক্তি করায়ত্ত করতে চাইছে। তারপরও আমাদের সুশীল সমাজ ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কোনো নীতিগত প্রতিক্রিয়া নেই। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার হয়ে আমরা দূষিত, বিকৃত, বিধ্বস্ত এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ পরাভূত হয়ে গেছি।

 ★★★সাংস্কৃতিক সীমারেখার অপরিহার্যতাঃ বিশ্বায়নের এ যুগে এক সংস্কৃতির সাথে অপর সংস্কৃতির মিশ্রণ হওয়াটা স্বাভাবিক বরং এখানে অনেক উপকারও আছে। সংস্কৃতি মানে হচ্ছে আত্মপরিচয় বা নিজেদের পারস্পরিক আচার-ব্যবহার, পোশাক, সাহিত্য, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদিকে বুঝায়। অনেক বিদেশী সাহিত্য আছে যা নৈতিকতা শেখায়, বিদেশী খাবার যা রুচিকর ছাড়াও অনেক বিদেশী সংস্কৃতি আছে যা আমাদের জন্য ইতিবাচক। আবার কিছু কিছু বিদেশী সংস্কৃতি আছে যা আমাদের সমাজের জন্য ক্ষতিকর, তার জন্য সীমারেখা দরকার। কিছু ক্ষতিকর সংস্কৃতির মধ্যে অন্যতম হল Extra -marital relationship, Live together, Valentin's Day etc. অনেকে আবার যুক্তি দেখাবেন যে, বিয়ে করতে হলে তো একটা মেয়েকে ভালোমত জানার জন্য তার সাথে মিশতে হবে। যার সাথে সারাজীবন থাকবো তাকে তো বুঝতে সময় নিতে হবে। এখানে আপনার যুক্তির চেয়ে অযুক্তি বেশি। কারণ, স্রষ্টা আপনি এবং আপনার সঙ্গিনীকে একজন মাত্র মানুষ বানান নি, সঙ্গিনী বানিয়েছেন। সুতরাং মতের কিছুটা পার্থক্য থাকবেই। এটাকে খারাপ বলছি কারণ, আমরা প্রতিনিয়ত পত্রিকায় দেখছি, বিয়ের প্রলোভনে তরুণীকে ধর্ষণ। এসব কি আদৌ ধর্ষণ ছিলো? দুজনের সম্মতি ছিল, বিয়ের প্রলোভন হলে ধর্ষণ কেমনে হবে? তো আপনার মত বুঝতে গিয়ে এইসব ঘটছে। প্রতিনিয়তই হচ্ছে।একসময় তারাও পরস্পরকে অনেক ভালোবাসত, বিশ্বাস করত। হয়ত ক্ষমতাশালীদের গুলো খবরে আসছে, আরাফাত সানি জেল খাটছে কিন্তু কত অসহায় বাবা-মার নন্দিনীরা নীরবে গর্ভপাত করে যাচ্ছে বা অপমান সয়ে যাচ্ছে জানেন? এসব হচ্ছে শুধুমাত্র তথাকথিত প্রচলিত প্রেম নামক শব্দটার অর্থাৎ একাজের জন্য কোনো সীমারেখা না থাকায়। এই সম্পর্কগুলো যদি হতো একটা শক্ত প্রতিশ্রুতির মধ্যে ভাঙলেও শারীরিকভাবে দুর্বল নারীজাতটাকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে দিলে কতই না সুন্দর হতো সমাজটা!!!!!!!!!!!আবার এটা কেউ ভাববেন না যে, আমি ভালোবাসার বিরোধী। আমি ভালোবাসি প্রচন্ড ভালোবাসি। আর এটাও কখনো কাম্য নয় যে, না দেখেই কেউ বিয়ে করবে। বাবা-মা-আত্মীয়-স্বজনের পছন্দে নয়, নিজের পছন্দেই বিয়ে করবে। এখানে হয়ত আপনি বলবেন, আমি তো এসব অপকর্ম করব না। আপনি করবেন কি করবেন না তার কোনো প্রমাণ দেখাতে পারবেন না। যদিও পারেন অসংখ্য মানুষ পারবে না, তো আমরা তো বেশিরভাগ মানুষের মতামতে সিদ্ধান্ত নেই। এটা তো নিশ্চিত যে, এটার অনুমোদনের কারণে এসব হচ্ছে। সুতরাং রাস্তাটা তো সোজা আগুনের দিকেই গেছে। হয়ত কেউ বেঁচে যেতে পারে তাই বলে কি আগুনের দিকে যাওয়ার রাস্তাটা ফুলবাগানে যাওয়ার রাস্তার মত সহজ রেখে দিব? একটা সীমারেখা কি দিতে পারি না? মৌলিক বিষয়ে একমত হলে অধিকারভুক্ত করে নেয়া? এটার আরও একটা নেতিবাচক দিক হচ্ছে, বিবাহ-বহির্ভূত প্রেমিকযুগলের একসাথে ঘুরাঘুরিটা অনেককে একাজে উৎসাহিত করে। আগুনে যেন কেরোসিন ঢালা।
★সবিশেষে, এসব সীমারেখা মেনে না চলাটা অনেকটা অর্থনীতির Opportunity Cost এর মতো, আনন্দ বিয়ের আগে হয়ে গেলে পরে সুযোগ ব্যয় হয়।

★★★সাংস্কৃতিক বিভ্রান্তি ও আমাদের সংস্কতিঃ মূলত সাংস্কৃতিক বিভ্রান্তি শুরু হয় দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে। তখন থেকে একটা অপশক্তি মুক্তিযুদ্ধের এই বিজয়টাকে ইসলামের বিরুদ্ধে দেখানোর এক অপচেষ্টা করে আসছে। প্রথমের লাইনটা হু হু করে ক্রীতদাসের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া। অনেক বেশি পুরুস্কার পাওয়া একটি বই, "হাজার বছরের বাঙালি সংস্কতি" এই বইটাতেই অনেক বেশি বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। উনি ওখানে বলতে চেয়েছেন যে, মুসলমানরা বিদেশী এবং হিন্দুরা এই দেশীয়। অথচ এটা সর্বজ্ঞ যে, সেনরা কর্ণাটক থেকে এসেছে। এর আগে এসেছিল পালরা, আর্যরা ইত্যাদি। সভ্যতার তাগিদে মানুষ স্থানান্তর হয়েছিল, এই জিনিসটা উনি সম্পূর্ন এড়িয়ে গেছেন। এভাবে অসংখ্য সমালোচনা ও বিভ্রান্তি রয়ে যায় বইটার উপর। তো কেন ভাই এসব উস্কানি? কার স্বার্থে? কার হুকুমে? এরপর পহেলা বৈশাখের মঙ্গলশোভাযাত্রাকে আমরা বলছি হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি। এটা তো কোনদিন ও বাঙালি সংস্কৃতি না। এটা সর্বপ্রথম ১৯৮৬ সালে যশোরে একটা শোভাযাত্রা বের করা হয়, এরপর ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীর ক্ষুদ্র পরিসরে একটা শোভাযাত্রা বের করে। অতিজোরে ৩০/৩২ বছর হবে। অথচ আমরা এটাকে বলছি হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি। আমরা এখানে ড্রাগনকে নিয়ে আসছি, ড্রাগন তো বাঙালি সংস্কৃতি না। এটা তো চীনা সংস্কৃতির সাইন। এরপর আমরা ময়ুরকে নিয়ে আসছি, ময়ুর তো উত্তর ভারতের সংস্কৃতি। আমরা মুখোশকে নিয়ে আসছি, মুখোশ তো শ্রীলংকার সংস্কৃতি। আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি তো হচ্ছে গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগী ইত্যাদি। এসব বাদ দেন, অন্তত আমাদের শাপলা, শালিক, দোয়েল এগুলোকে রাখেন। নাহ্ সেগুলো ও নেই। এটার বিপরীতে আমরা কি করছি, দাড়িওয়ালা, টুপিওয়ালা, মসজিদ, পাঞ্জাবী, চাঁদ, তারকা ইত্যাদিকে ব্যবহার করছি অামাদের অপশক্তি হিসেবে। এটা কেন? মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন, তারা কি মুসলমান ছিলেন না? বেশিরভাগই তো মুসলমান। এরপর দেখেন, নাটক বা সিনেমায় সবচেয়ে গুন্ডা যাকে দেখানো হয়, খারাপ চরিত্রের লোক যাকে দেখানো হয়, মসজিদের ইমাম সে। হাতে তসবিহ। তো এসবের ফলে ইসলাম সম্পর্কে নতুনপ্রজন্মের মাঝে একটা ভীতি ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, যারা ইসলাম মানে তারা সমাজের শত্রু, সংস্কৃতির ও শত্রু, মুক্তিযুদ্ধের ও শত্রু। কিন্তু কেন ভাই? এই অঞ্চলে প্রায় একহাজার বছর ধরে মুসলিম জনগোষ্ঠীটা বসবাস করে আসছে। কৃষিকাজ করছে। এটাই তো হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি। আমাদের সংস্কৃতি তো হচ্ছে সাম্প্রদায়িক_সম্প্রীতি । এই অঞ্চলে প্রায় হাজার বছর ধরে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান পরস্পরকে ভালোবেসে পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। পরস্পর পরস্পরের বিপদাপদে এগিয়ে আসছে। পরস্পর বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করে আসছে। এটাই তো আমাদের সংস্কৃতি। ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধ ও মমতায়, উস্কানি নয়, বিদ্বেষ নয়।

Comments

Popular posts from this blog

মরীচিকার পেছনে ছুটো না ওগো প্রিয়

আমাদের কর্মস্পৃহা:  আমরা সুখের চেয়ে সম্মানকে বেশি গুরুত্ব দিই। আমরা প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছি জীবিকার তাগিদে। ভোরে ঘুম থেকে ওঠে খাওয়ামাত্রই কাজে নেমে পড়ছি। সারাদিন শারীরিক-মানসিক শ্রমের মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করছি। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে রাতটুকু বিশ্রাম নিয়ে আবার সকালে কাজে লেগে পড়ছি। এভাবে দিন-রাতের আবর্তনে আমাদের নির্ধারিত আয়ু শেষ হচ্ছে। আমরা আয়েশী জীবন ত্যাগ করেছি, বিশ্রাম ত্যাগ করেছি। আমরা ছুটে চলছি অর্থ-বিত্তের পেছনে, ক্ষমতার পেছনে, আমরা উঁচু আসনে বসার প্রতিযোগিতায় ছুটে চলছি। কারণ, আমরা সম্মান এবং মর্যাদা পাবার আশায় এই পরিশ্রান্ত পথে ছুটছি। এই ভেবে করছি যে, অর্থ-বিত্ত, ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, প্রসাদ এসবেই মানুষের মর্যাদা আবর্তিত। ভাবছি, টাকা-পয়সা না থাকলে কেউ সম্মান করে না। আমাদের ভাবনাটা একেবারে অবান্তর নয়, অনেকটা ব্যবহারিক।    কর্মস্পৃহার বাস্তবতা:  অর্থ-বিত্ত কতখানি সম্মান ও মর্যাদার আসন ধরে রেখেছে তা যাচাই করতে কতিপয় উদাহরণ বলা যেতে পারে। যেমন- জামালপুর জেলার সাবেক জেলা প্রশাসকের একটা ভিডিও ভাইরাল হয়। এরপর তার সম্মান কতটুকু সেটা সমাজ বিচার করে। একইভাবে আমি বলতে পারি ...

ধর্ষণের কারণ: পোশাক, মানসিকতা? নাকি আরো কিছু?

পবিত্র কুরআনের একটি গুরুত্বর্পূণ আয়াত হচ্ছে,   “ হে বিশ্বাসীগণ , যদি কোনো ফাসেক কোনো সংবাদ নিয়ে আসে তবে তা যাচাই করো যেন তোমরা অন্য কোনো সম্প্রদায়ের উপর ক্ষতি করে না বসো এবং তোমাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হতে না হয় ৤ ” ( ৪৯ : ১০ ) এছাড়াও এই সূরায় কাউকে মন্দ নামে ডাকা , কাউকে উপহাস করা , গীবত করা , পরচর্চা করা , অহেতুক ধারণা করা ইত্যাদি বিষয় কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে কোনো কোনো ধারণা পাপ ৤ পুরো একটা সূরা নিয়ে কথা বলা , তার শানেনূযুল , এবং তার জন্য প্রণীত আইন নিয়ে কথা বলা আমার পক্ষে অসম্ভব ৤ আর মানবসমাজের সামাজিক শৃঙ্খলা ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য এইসব নসীহতের গুরুত্ত্ব বলার অপেক্ষা রাখে না । তবে অন্তত এটি বলা যায় যে , এইসব আল্লাহতায়ালা নিষেধ করেছেন । তাহলে কোনো মুসলমানের বা মানুষের এটি উচিত নয় যে , কোনো কথা শোনার সাথে সাথে তার সত্যতা যাচাই না করে তার প্রতিক্রিয়া জানানো যাবে না । কিন্তু আজকে আমরা যা দেখি দেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উপর হামলা হয়েছে গুজবের কারণে । অবাক হওয়ার মত বিষয় হচ্ছে সরাসরি কুরআনের আয়াত থাকার পরও আমরা এই কাজই করছি যে , একটি সম্প...

সভ্যতার বিবর্তন ও ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক অর্ডার

    মানুষের উন্নতির পরিণত রূপই সভ্যতা। দুনিয়ায় মানুষের উৎপত্তির সময় নিয়ে দর্শনগত ঐকমত্য না থাকলেও প্রাচীনসভ্যতার ইতিহাস নিয়ে দ্বিমত নেই। প্রায় ৮/১০ হাজার বছর আগে অ্যাসীরীয়রা লোহার অস্ত্রে সজ্জিত হওয়ার বিজ্ঞান, পৃথিবীর অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ বের করার মত ভৌগলিক জ্ঞান, রাষ্ট্রচিন্তায় সামরিক রাষ্ট্রের ধারণা আবিষ্কার করে। সমসাময়িক সুমেরীয়রা তৈরি করে উন্নত সেচব্যবস্থা, চাকা আবিষ্কার করে, জলঘড়ি, চন্দ্রপঞ্জিকার আবিষ্কার করে, কিউনিফর্ম বর্ণমালার উদ্ভাবন করে ইত্যাদি। আবার সেই কিউনিফর্ম অ্যালফাবেটে ব্যবিলনীয় সভ্যতায় রচিত হয় মহাকাব্য গিলগামেশ। ব্যবিলনীয় সভ্যতার স্থপতি অ্যামোরাইট নেতা হাম্মুরাবি আইনসংকলন করেন। তারাই পৃথিবীর প্রাচীনতম মানচিত্র আঁকেন। ক্যালডীর সভ্যতার স্থপতি নেবুচাঁদনেজারের শূন্যউদ্যান বা ব্যবিলনের শূন্যউদ্যান (The Hanging Garden of Babylon) আজও পৃথিবীর প্রাচীন সপ্তার্শ্চযের একটি হিসেবে বিবেচিত। এই ক্যালডীয়রা সপ্তাহকে ৭ দিন এবং ‍প্রতিদিনকে জোড়া ১২ ঘণ্টায় ভাগ করেন। খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ অব্দে মিশরীয়রা জ্যামিতি, পাটিগণিত, যোগ, বিয়োগ ও ভাগের ব্যবহার শিখেছিল। তারা সৌরপঞ্জিকা চালু করে...