আমাদের দুর্ভাগ্যই বলতে হবে যে আমরা আমাদের বাংলা ভাষায় সালাত শব্দের প্রতিশব্দ হিসাবে নামায শব্দ ব্যবহার করি। কুরআনুল কারিমে যে সালাত শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তার প্রতিশব্দ হিসেবে ফারসি নামায শব্দ ব্যবহৃত হতে পারে না। নামায শব্দের উৎপত্তিগত অর্থ উপাসনা। এ উপাসনা অগ্নিউপাসক পার্সিদের মধ্যে ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বেও প্রচলিত ছিল। সে উপাসনার বিষয়বস্তু ছিল অগ্নি। কুরআন-উল-করীমে ব্যবহৃত সালাত শব্দের অর্থ শুধু উপাসনা নয়। তার অর্থ হচ্ছে যে সর্বশক্তিমান ও সার্বভৌম সৃষ্টিকর্তার আদেশ-নির্দেশের প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা স্থাপন করে তার কাছে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ।
সালাতের মূল লক্ষ্য হচ্ছে একদিকে জীবনকে নানান ধরনের রিপু এবং অসৎ প্রবৃত্তির প্ররোচনা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে সেই সর্বশক্তিমান আল্লাহ্র ওপর নির্ভরশীল হওয়ার জন্য প্রস্তুতি এবং সঙ্গে সঙ্গে তার গুণাবলী এ জগতে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া।
এ সালাতের মধ্যে ইসলামের অপরাপর কর্তব্যের মত দুটো দিক রয়েছে। একটিকে বলা যায় তার পারমার্থিক দিক, অপরটিকে বলা যায় তার সামাজিক দিক। সামাজিক দিকের আলোচনা করলে দেখা যায় এতে দিনে পাঁচবার সকল মুমিন-মুসলিমকে একত্রিত হওয়ার জন্য তাগিদ রয়েছে। আল্লাহ্র রসূল (সঃ) নির্দেশ নিয়েছিলেন,যদি কেউ মসজিদে সালাত আদায় না করে বাড়িতে আদায় করে তা হলে তার ঘর পুড়িয়ে দাও’। এতে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে সালাতের উদ্দেশ্যে মুমিন মুসলিমদের একত্রিত হওয়াও তার একটা লক্ষ্য ছিল। মুসলিমদের জীবনে ঐক্য,প্রেম,মৈত্রী,সৌহার্দ্য প্রভৃতি সৃষ্টির জন্য তাদের প্রত্যেক দিবারাত্রিতে অন্ততপক্ষে পাচঁবার একত্রিত হওয়ার সুযোগ দান করে বলে সালাতের রয়েছে এক সামাজিক গুরুত্ব।
প্রকৃতপক্ষে হযরত রসূল-ই-আকরাম (সঃ) ও খুলাফায়ে রাশেদিনের আমলে মসজিদ ছিল একাধারে মুসলিমদের পার্লামেন্ট, সুপ্রিম কোর্ট, গবেষণাগার ও বিশ্ববিদ্যালয়। মসজিদকে কেন্দ্র করেই জীবনবিকাশের ধারাগুলো চালু ছিল। এজন্য আল্লাহ্র আদেশ পালন করার জন্যতো বটেই, পরোক্ষে মুসলিম জীবনের নানাবিধ আইন-কানুন প্রণয়ন করার জন্য বা বিচার লাভের জন্য মসজিদে জমায়েত হওয়া ছিল অবশ্য প্রয়োজনীয়। এ মসজিদে অবস্থান করেই মুসলিমরা এ সৃষ্টিতত্ত্ব বা এ দুনিয়ার বিকাশের আদি কারণ সম্বন্ধে গবেষণা করতেন। এ মসজিদে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে শিক্ষালাভ করতেন। কাজেই এ দুনিয়ার নানা বিষয়ে খাঁটি জ্ঞান লাভের জন্য সালাত সম্পাদন উপলক্ষে মসজিদে সমবেত হওয়া মুসলিমদের জীবনে অবশ্য কর্তব্য ছিল।
অপরদিকে সালাতের মধ্যে মানব-জীবনের যে পূর্ণ আত্মসমর্পণের ভার রয়েছে সে সূত্রে মানুষের পক্ষে আল্লাহ্র সান্নিধ্য লাভেরও সম্ভাবনা রয়েছে। আল্লাহ্র কাছে আত্মসমর্পণের মাধ্যমেই আল্লাহ্র প্রকৃতরূপের পরিচয় পাওয়া যায় বলে মানব-জীবনে রয়েছে দৃঢ় প্রত্যয়। ইসলামের অপর দিক হচ্ছে মারিফত। তাতে বলা হয় সালাতের মাধ্যমে সালাত আদায়কারীর দিলের মধ্যে রোশনি বা জ্যোতির আবির্ভাব হয় এবং সে জ্যোতির আলোকে আল্লাহ্র স্বরূপ সম্বন্ধে মানুষের পক্ষে উপলব্ধি করার সুযোগ দেখা দেয়।
যেহেতু ইসলামের মধ্যে ইহলৌকিক অথবা পারলৌকিক বলে এমন কোন স্পষ্ট ভেদরেখা নেই, এজন্য সালাতের মধ্যে যদিও এরূপ কোন ভাগ করা হয়নি তবুও একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সালাতের মধ্যে আধ্যাত্মিক জীবন বিকাশেও পদ্ধতি রয়েছে।
বই: জীবন সমস্যার সমাধানে ইসলাম।
আমাদের কর্মস্পৃহা: আমরা সুখের চেয়ে সম্মানকে বেশি গুরুত্ব দিই। আমরা প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছি জীবিকার তাগিদে। ভোরে ঘুম থেকে ওঠে খাওয়ামাত্রই কাজে নেমে পড়ছি। সারাদিন শারীরিক-মানসিক শ্রমের মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করছি। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে রাতটুকু বিশ্রাম নিয়ে আবার সকালে কাজে লেগে পড়ছি। এভাবে দিন-রাতের আবর্তনে আমাদের নির্ধারিত আয়ু শেষ হচ্ছে। আমরা আয়েশী জীবন ত্যাগ করেছি, বিশ্রাম ত্যাগ করেছি। আমরা ছুটে চলছি অর্থ-বিত্তের পেছনে, ক্ষমতার পেছনে, আমরা উঁচু আসনে বসার প্রতিযোগিতায় ছুটে চলছি। কারণ, আমরা সম্মান এবং মর্যাদা পাবার আশায় এই পরিশ্রান্ত পথে ছুটছি। এই ভেবে করছি যে, অর্থ-বিত্ত, ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, প্রসাদ এসবেই মানুষের মর্যাদা আবর্তিত। ভাবছি, টাকা-পয়সা না থাকলে কেউ সম্মান করে না। আমাদের ভাবনাটা একেবারে অবান্তর নয়, অনেকটা ব্যবহারিক। কর্মস্পৃহার বাস্তবতা: অর্থ-বিত্ত কতখানি সম্মান ও মর্যাদার আসন ধরে রেখেছে তা যাচাই করতে কতিপয় উদাহরণ বলা যেতে পারে। যেমন- জামালপুর জেলার সাবেক জেলা প্রশাসকের একটা ভিডিও ভাইরাল হয়। এরপর তার সম্মান কতটুকু সেটা সমাজ বিচার করে। একইভাবে আমি বলতে পারি ...

Comments
Post a Comment