আমরা সচরাচর এ ধরনের ঘটনা নিয়ে বিশ্লেষণ করি না।
ঘটনা:
ঘটনাটি ঘটেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফিনিক্সে। স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, গান গাইতে গাইতে তিন সন্তানকে হত্যা করেছেন মা। তার নাম রাচেন হেনরী। আর এ নিয়ে তার কোনও অনুশোচনাও নেই। এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর সন্তানদের নিথর দেহগুলি লিভিং রুমে টেনে এনে শুইয়ে রেখেছিলেন হেনরি।
পুলিশ খুনের বর্ণনা দিয়ে জানান, হেনরির তিন বছরের ছেলে তার ছোট বোনকে খুন করার সময় মাকে অনুরোধ করেছিল যে খুন না করে। কিন্তু মা শোনেননি। ১ বছরের মেয়ে শ্বাস নেওয়া বন্ধ করলে হেনরি চলে যান বেডরুমে। সেখানে তিন বছরের ছেলেকে বাগে পেতে তার খানিকটা সময় লেগেছিল। শিশুটির বাবা এবং ফুফু প্রায় দরজার কাছে চলে এসেছিলেন। এরপর তাদেরকে মিথ্যে কথা বলে ছেলেকে নিয়ে পাশের ঘরে চলে যান মা। সেখানে নিয়ে গিয়ে গলার নলি কেটে দেন মহিলা। যাতে চিৎকার কারও কানে না যায় সেজন্য গান গাইছিলেন নারী।
এরপর স্বামী ও তার বোনের সঙ্গে লিভিং রুমে এসে বসে বসে গল্প করেন ওই নারী। এরপর তৃতীয় সন্তানকে খাওয়ানোর নামে ঘরের ভেতর যান তিনি। এই বাচ্চাটি ৭ মাস বয়সী। ঘরের ভিতর ওই সন্তানকেও হত্যা করেন। বাড়ির বাকিরা বাচ্চাদের খোঁজ নেন দীর্ঘ সময় পর। তারপরেই পুরো ঘটনা সামনে আসে। হেনরিকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এমন ঘটনায় মহিলার স্বামী বা সন্তানের বাবার করণীয় কী হবে?
সন্তানদের বাবা, মহিলার স্বামী তার পরেরদিন কী করেছেন জানেন?
তিনি তার সন্তানদের স্মৃতিচারণের কথা বলতে গিয়ে কেঁদেছেন। সুন্দর ফুটফুটে সন্তানদের হারিয়ে তিনি সর্বস্বান্ত হয়েছেন। আবার স্ত্রীর জন্যও কেঁদেছেন। সবার কাছে স্ত্রীর জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। স্ত্রীর ব্যাপারে বলেছেন, "সে এমন নয়, সে আমাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু। সে আমাকে, আমার সন্তানদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং তাদের প্রতি যত্নশীল ছিলেন।"
এমন ঘটনা আমাদের দেশে ঘটলে কী হতো? মহিলার স্বামী এবং আত্মীয়-স্বজনের আচরণ কেমন হতো তা জানি না।
কিন্তু তার স্বামীর এ আচরণের কারণ আমরা বলতে পারি।
সেটি হচ্ছে Attitude. একজন মানুষের সমস্ত আচরণ নিয়ন্ত্রণকারী বস্তু হলো তার এটিচিউড। এই এটিচিউডের কারণে আমরা কোনো কাজের জন্য সামনে আগাই অথবা পেছনে চলে যাই। এটিচিউড শুধু আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে তা নয়, কর্মকাণ্ডও নিয়ন্ত্রণ করে।
![]() |
| Attitude is everything |
Attitude যদি আমরা বুঝতে পারি তাহলে আমরা মানব মন এবং কর্মকাণ্ডের অনেকাংশে বুঝতে পারি।
ইংরেজিতে বলা হয় feelings toward something or someone either positive or negative. অর্থাৎ কোনো বস্তু বা ব্যক্তির প্রতি ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক অনুভূতি। আর এই ফিলিংস যখন Uncompromising হয়ে যায় তখনই আমরা সামনে এগোতে পারি। Uncompromising হওয়ার জন্য Cognitive বা জ্ঞানভিত্তিক হওয়াটাই আবশ্যকীয়। উপরের ঘটনায় ভদ্রলোক স্বামী cognitive ছিলেন বলা যেতে পারে। তিনি তার স্ত্রীকে শাস্তি না দিয়ে বরং তার মানসিক অবস্থা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন এটি তার স্ত্রীর স্বাভাবিক আচরণ নয়। Mental Health অনুসারে মানুষের আচরণ অনেক সময় অস্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে। আমরা অনেক সময় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাই। এমনকি ঘটনা ঘটার সাথে সাথে অথবা শোনামাত্রই প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ফেলি। আমরা অনেক সময় ঘটনা বা উপদেশের সত্যতা ও বাস্তবতা উপলব্ধি করতে সময় নিই না। একটু সময় নিলে হয়ত প্রতিক্রিয়াটাও সুন্দর হয়। এটি আমাদের জ্ঞানগত সীমাবদ্ধতা। জ্ঞানগত সমৃদ্ধি মানুষকে আচরণগত সমৃদ্ধিসহ অনেক উচ্চতায় নিয়ে যায়। উল্লিখিত ঘটনায় আমরা এ রকম নৃশংস ঘটনাকে সমর্থন করছি না এবং খুনির পক্ষেও নই। এই ঘটনার বিচারের রায়ে উক্ত মহিলার ফাঁসি হতে পারে খুনের দায়ে। তার স্বামীও বিচারিক লোক। তিন সন্তান হারিয়ে তিনি সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছেন। তবুও তিনি Attitudinal থেকেছেন। একজন মানুষের বিচার তখনই হওয়া উচিত যখন সে তার দোষ বুঝতে পারে। বিচার বা রায়ে তিনটি বিষয় মাথায় রাখতে হয়।
১. ক্ষতিপূরণ।
২. ভবিষ্যতে অপরাধ পুনরাবৃত্তি না হওয়ার মানসিকতা তৈরি।
৩. অপরাধীকে তার অপরাধ অনুধাবন করানো যাতে তার উপর অবিচার না হয়।
বিচারের ৩য় স্মর্তব্যটা কঠিন। বিচারে অপরাধীর প্রতিও যেন অবিচার না হয়। অপরাধী যদি তার অপরাধ বুঝতে পারে, তখন সে তার প্রতি ন্যায়বিচারে আরোপিত শাস্তিকে মন থেকে মেনে নেবে। মনে মনে বলবে, আমি পাপ করেছি তাই শাস্তি পাচ্ছি। বিচারে আরোপিত শাস্তির চেয়ে নিজের মনের কাছে অনুশোচিত হবে। গল্পের শুরুর উদাহরণে, হত্যাকারীকে মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হিসেবে দেখানো হয়েছে। আর মানসিক সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে এনে একজন অপরাধীকে তার অপরাধের মাত্রা অনুসারে ক্ষমা, লঘুদণ্ড বা গুরুদণ্ড দেয়া হয়। আবার বড় অপরাধীকেও বিচারে ক্ষমা করে দেয়া যেতে পারে যদি ভুক্তভোগী তাকে ক্ষমা করে দেয়। আল্লাহর বিধানেও বিচারব্যবস্থা একই। জ্ঞানগত এ মনস্তাত্ত্বিক যোগ্যতা মানুষের এটিচিউডকে Uncompromising করে তোলে। জ্ঞানগত যোগ্যতা ছাড়া মানুষ সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা নিয়ে বসবাস করতে পারে না। হয়ত এ কারণে কোনো এক লেখক বলেছিলেন, জ্ঞানহীন মানুষ পশুর সমান।
এক জ্ঞানী লোককে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মানুষ কখন বড় হয়?
জবাবে জ্ঞানী লোক বলেছিলেন, মানুষ স্বাধীন না হলে বড় হয় না।
অর্থাৎ পরাধীন কেউ বড় হতে পারে না। এই বড় বা ছোট; স্বাধীন বা পরাধীনতার বিষয়টা দম্ভ বা অহংকারের নয়। বড় হওয়া বা স্বাধীন হওয়া হচ্ছে জ্ঞানের মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারা ও সঠিক বিচার করতে পারা। জ্ঞান বা পড়াশোনার এই গুরুত্বের কারণে হাদিসে বলা হয়েছে, জ্ঞানীর ঘুম মূর্খের ইবাদতের চেয়ে উত্তম। আর সমস্ত জ্ঞানের উৎস হচ্ছে মহান আল্লাহর দেয়া বিধান। আর তারা বড় মোজেজা হচ্ছে, দুনিয়াবি শত শত গবেষণার পর তারা যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয় তা আল্লাহর দেয়া বিধানের সাথে মিলে যায়। হোক সেটা নারী-পুরুষের পর্দার বিধান অথবা ফৌজদারি অপরাধের শাস্তি এমনকি সবক্ষেত্রেই। এজন্য আমাদের উচিত জ্ঞানগত প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে আমাদের এটিচিউডকে Uncompromising করে তোলা।
(ঘটনার লিংক https://people.com/crime/husband-mass-mom-allegedly-killed-children-asks-forgiveness-for-wife/


Comments
Post a Comment